মতামত

সাংবাদিকতায় উপকূল

শংকর লাল দাশ
০৬ ডিসেম্বর ২০২৫, ০২:২৫ দুপুর

বাংলাদেশের উপকূল বলতেই আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে সাগর তীরবর্তী বিস্তীর্ণ অঞ্চলের দৃশ্য, যেখানকার মানুষ নিত্য ঝড় বন্যা জ্বলোচ্ছাস কিংবা নদী ভাঙ্গনের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকে। কিন্তু এর বাইরেও উপকূলে হাজারো সমস্যা-সম্ভাবনা রয়েছে, আমাদের প্রথাগত গণমাধ্যমে যার অনেক কিছু আসে না। এড়িয়ে যায় আমাদের নীতিনির্ধারকদের চোখ। ফলে বহু সমস্যার যেমন সমাধান হয়না, তেমনি অজস্র সম্ভাবনাও যথাসময়ে আলোর মুখ দেখে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সমস্যা-সম্ভাবনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট লোকজনরাও পড়ে বিপাকে।

৭১০ কিলোমিটার দীর্ঘ তটরেখা আর ১৯ টি জেলা নিয়ে আমাদের বিস্তীর্ণ উপকূল। ভৌগোলিক অবস্হানসহ সমস্যা-সম্ভাবনার অনেক ক্ষেত্রেই জেলাগুলোর মধ্যে যথেষ্ট সাযুজ্য রয়েছে। যেমন প্রায় সবগুলো জেলা সমুদ্রের তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে। নদী ভাঙ্গনসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগের চিত্রও একই রকমের। আরো অনেক সমস্যার ধরণ প্রায় একই। সম্ভাবনার ক্ষেত্রেও জেলাগুলোর মধ্যে অনেক সাযুজ্য রয়েছে। যেমন মৎস্য এবং পর্যটনের বিষয় দুটি সুনির্দিষ্ট ভাবে উল্লেখ করা যায়। উপকূলের প্রতিটি অঞ্চল কমবেশি মৎস্য সম্পদ ও পর্যটন সম্ভাবনায় অত্যন্ত সমৃদ্ধ। কৃষিতেও রয়েছে এগিয়ে। 

এ ধরনের কমন বিষয়গুলোর বাইরে যদি আমরা গভীর দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করি তবে দেখা যাবে, এমন কিছু সমস্যা-সম্ভাবনা রয়েছে; যা উপকূলের একটি অঞ্চলকে অন্য অঞ্চল থেকে বিভক্ত বা আলাদা করেছে। যেমন সাতক্ষীরা-যশোর অঞ্চলের জলাবদ্ধতা আর পটুয়াখালী অঞ্চলের জলাবদ্ধতার ধরনধারণ ভিন্ন। আবার কক্সবাজার অঞ্চলে লবণ চাষ করতে গিয়ে যে সমস্যার সৃষ্টি হয় তা থেকে দেশের অন্যান্য অঞ্চল মুক্ত। পটুয়াখালী অঞ্চলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আলু ও তরমুজ চাষের ব্যাপক বাড়াবাড়িতে যেভাবে সার-কীটনাশকের যথেচ্ছ ব্যবহার হচ্ছে, তাতে অদূর ভবিষ্যতে পরিবেশে বড় ধরনের বিরূপ প্রভাবের আশংকা তৈরি হচ্ছে, তা থেকে দেশের অন্যান্য উপকূল অঞ্চল এখন পর্যন্ত অনেকটাই মুক্ত আছে। 
মোটা দাগে দেখা সাযুজ্যের এই বিষয়গুলোর বাইরে উপকূলের প্রতিটি জনপদে এমন অনেক বিষয় আছে, যা একটিকে আরেকটি থেকে পৃথক করেছে। অর্থাৎ পটুয়াখালী অঞ্চলের নিজস্ব কিছু সমস্যা রয়েছে, যা উপকূলের অন্যান্য অঞ্চলে নেই। আবার অন্য অঞ্চলের সমস্যার সঙ্গে পটুয়াখালী অঞ্চলের মিল নেই। যেমন পটুয়াখালীর চরাঞ্চলে সরকারি খাসজমি নিয়ে যে হাজারো সমস্যা, তা অন্যান্য অঞ্চলে ততটা প্রকট নয়। যশোর খুলনা সাতক্ষীরায় সুন্দরবনভিত্তিক যে সকল ক্ষুদ্র পেশাজীবি গোষ্ঠী রয়েছে এবং তাদের যে-সব সমস্যা রয়েছে, তা অন্য এলাকায় অনুপস্থিত। এভাবে উপকূলের প্রতিটি এলাকার নিজস্ব কিছু সমস্যা রয়েছে, যা তাদের অন্য এলাকা থেকে পৃথক করেছে। এসব সমস্যা নিয়ে দেশে সাংবাদিকতায় অনেক সুযোগ রয়েছে, যা আমাদের ব্যবহার করা প্রয়োজন। 

আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, উপকূলের সাংবাদিকতার সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগের বিষয়টি অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িয়ে আছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছাড়া আমাদের গণমাধ্যম খুব কমক্ষেত্রেই উপকূলের দিকে দৃষ্টি দেয়। বিশেষ করে ঝড় বন্যার মতো দুর্যোগই কেবল উপকূলকে গোটা দেশের সামনে তুলে ধরে। বছরের অন্যান্য সময় উপকূল উপকূলের মতোই আঁধারে তলিয়ে থাকে। অথচ উপকূলকে তুলে ধরতে পারে এমন অজস্র সমস্যা-সম্ভাবনা চোখের সামনেই দৃশ্যমান রয়েছে। যা তুলে ধরার জন্য কেবল চাই অন্তর্দৃষ্টি। 
উপকূলের মানুষকে যদি আমরা উন্নয়ন অগ্রগতিতে প্রাধান্য দেই, তবে দেখা যাবে এমন অনেক মানুষ রয়েছে; যারা আজো উন্নয়নের মূল স্রোত থেকে পিছিয়ে রয়েছে। বিশেষ করে দুর্গম প্রত্যন্ত চর-দ্বীপ গাঁয়ের মানুষের সমস্যা-সম্ভাবনার ক্ষেত্রগুলোকে চিহ্নিত করা এবং তা তুলে ধরায় আমাদের আরো সক্রিয় হতে হবে। 

এ প্রসঙ্গে একটি উদাহরণ তুলে ধরা যেতে পারে। ‘মানতা সম্প্রদায় কিংবা জনগোষ্ঠী’ শব্দ উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে উপকূলের নদী সাগরে ভেসে বেড়ানো সব ধরনের অধিকার বঞ্চিত একদল মানুষের চিত্র। এই যে চোখের সামনে ভেসে ওঠে, এ কাজটা কিন্তু সংবাদমাধ্যমের কারণেই সম্ভব হয়েছে। ১৯৯৮ সালের দিকে দৈনিক জনকণ্ঠে প্রথম এই জনগোষ্ঠী নিয়ে লেখালেখি শুরু হয়। যা পরবর্তীতে অন্যান্য গণমাধ্যমে উঠে আসে। এতে করে জনগোষ্ঠীর প্রতি সরকারি-বেসরকারি দৃষ্টি পড়ে। পটুয়াখালী অঞ্চলে কমবেশি এ জনগোষ্ঠীর উন্নয়নে কাজ হয়েছে। জনগোষ্ঠীর মানুষকে এই যে এগিয়ে নেওয়া, এটি সাংবাদিকতার কল্যানে অনেক সহজ হয়েছে। অথচ এ জনগোষ্ঠী উপকূল অঞ্চলে কয়েক শ বছর ধরে পুরুষানুক্রমে ভাসমান অবস্হায় বাস করছে। এর আগে তাদের কোনো পরিচিতিই ছিল না। ‘মানতা’ নামে যে একটি জনগোষ্ঠী রয়েছে, তা ছিল কল্পনার বাইরে। 
গণমাধ্যমের সঠিক ব্যবহার একটি আজীবনের  বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য যে কতটা সুফল বয়ে আনতে পারে, তার দৃষ্টান্ত হচ্ছে মানতা সম্প্রদায়। এ উদাহরণ সামনে রেখে উপকূলে এ ধরনের আরো কোনো জনগোষ্ঠী রয়েছে কি না, তা খুঁজে বের করা এবং তাদের যথাযথ উপস্থাপন করা গণমাধ্যমের অন্যতম প্রধান কাজ। গণমাধ্যমকে গণমানুষের জন্য গড়ে তোলার কাজটিও যত্নের সঙ্গে আমাদেরই করতে হবে। তবেই উপকূল এগোবে। উপকূলের মানুষ এগোবে।